শুক্রবার, ২০-জুলাই ২০১৮, ১০:২৩ পূর্বাহ্ন

সোনালী ব্যাংকে পদোন্নতিতে ব্যাপক অনিয়ম

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ জুলাই, ২০১৮ ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: সোনালী ব্যাংকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য, অনিয়ম ও ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য মিলেছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি এই ব্যাংকটিতে পদোন্নতিতে বৈষম্যের কারণে একধরনের অস্থিরতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রমেও। 
সূত্র বলছে, পদোন্নতি বঞ্চিত মেধাবী অফিসারদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। সিনিয়র-জুনিয়র কেউ কাউকে পাত্তা দিচ্ছেন না। এর জন্য সাবেক সিবিএ নেতাসহ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও প্রদীপ কুমার দত্তকে দায়ী করা হয়েছে। সেই সাথে ব্যাংকটির আরও কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, অবৈধ লেনদেনসহ ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণের কথা জানা গেছে। এদেরসহ এর পেছনে জড়িত অন্য দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সদস্যদের বিরুদ্ধেও শাস্তির দাবি করেছেন বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্তরা। 
সোনালী ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ২০০৪ সালে বুয়েট কর্তৃক গৃহীত ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে তৎকালীন সিবিএ নেতারা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে সম্পূর্ণ আর্থিক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে সিনিয়র কম্পিউটার অপারেটর পদে জনবল নিয়োগ করেন। এ ক্ষেত্রে নিয়োগকৃতদের অনেকের দাখিলকৃত কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সনদ ভুয়া বলে জানা গেছে। কিন্তু কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদেরকে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। 
পদোন্নতিতে অনিয়ম
ভুয়া তথা জাল জালিয়াতির সনদের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ব্যাংকের নিয়ম-নীতি তথা আইন-কানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি। জানা গেছে, সিনিয়র কম্পিউটার অপারেটর পদটি ‘ব্লকড পোস্ট’। এই পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতির নিয়ম নেই। কিন্তু সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে পদোন্নতি নীতিমালা অমান্য করে ২০০৮ সালে তাদেরকে কম্পিউটার সিস্টেম ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অথচ ২০০৮ সালের পদোন্নতির নীতিমালা অনুযায়ী ওই সকল কম্পিউটার অপারেটর ও সিনিয়র অপারেটরগণ পদোন্নতির ক্ষেত্রে ন্যূনতম যে নম্বর পাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা না পাওয়ার পরও সম্পূর্ণ নিয়ম লঙ্ঘন করে তাদেরকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ব্যাংকের অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদেরকে ‘এ্যাসিস্টেন্ট অপারেশন ম্যানেজার’ পদে পদায়ন করা হয়েছে। যদিও ওই কম্পিউটার অপারেটর ও সিনিয়র অপারেটরগণের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই সনদ জালিয়াতির অভিযোগ ছিল। তারপরও কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া তাদেরকে প্রমোশন দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকে বিভিন্ন সময়ে আইটি সংশ্লিষ্ট বুয়েট, চুয়েট, খুয়েট, ঢাবির ডিগ্রিধারী মেধাবী ও অভিজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা পদোন্নতি ও পদায়ন পাচ্ছেন না। তাদেরকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছে। বঞ্চিত মেধাবীরা এতে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। 
তারা বলছেন, মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অথচ কম্পিউটার অপারেটর ও সিনিয়র কম্পিউটার অপারেটরগণকে নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে ব্লকড পোস্ট হওয়া সত্ত্বেও বারবার পদোন্নতি ও পদায়ন করা হয়েছে। ফলে সরকারি এই ব্যাংকটির সুনাম ক্ষুণœ হয়েছে। কর্মপরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। যোগ্যদের ডিঙিয়ে অযোগ্যদের এরকম সুবিধা দেওয়ায় মেধাবী সকলের মধ্যে একধরনের অসম্মানবোধ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 
দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্যদের বারবার পদোন্নতি
যাদেরকে দুর্নীতির মাধ্যমে ভুয়া সনদে ২০০৪ সালে চাকরি দেওয়া হয়, তাদেরকেই ২০০৮, ২০০৯ সালের পর ২০১২, ২০১৫, ২০১৭ এবং সর্বশেষ চলতি বছরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। 
সূত্র বলছে, ২০১২ সালে ‘এ্যাসিস্ট্যান্ট অপারেশন ম্যানেজার’ থেকে কম্পিউটার অপারেটরগণ ‘অপারেশন ম্যানেজার’ পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। যদিও সোনালী ব্যাংকের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, এটা ছিল তাদের ব্লকড পোস্ট বা পদোন্নতির শেষ ধাপ। তবে অপারেশন ম্যানেজার পর্যন্তই থেমে থাকেনি তাদের পদোন্নতি। ২০১৫ সালে অর্গানোগ্রাম (পদোন্নতি নীতিমালা) পরিবর্তন করে ‘অপারেশন ম্যানেজার’ এবং আইটি সংশ্লিষ্টদেরকে জেনারেল বা সাধারণ পদমর্যাদায় উন্নীত করা হয়। যদিও তৎকালীন ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের জোর আপত্তি ছিল এই পদোন্নতিতে। এমনকি তিনবার এ সংক্রান্ত নোট পরিচালনা পর্ষদ ফেরত পাঠায়। কিন্তু ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে আর্থিক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে তাদেরকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) পদমর্যাদায় একীভূতকরণ করা হয়। একইভাবে তাদেরকে ২০১৮ সালে ‘এ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার’ পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি (বিআরসি) কর্তৃক নিয়োগকৃত সিনিয়র অফিসার, অফিসার, কৃষিবিদ, ফিন্যান্সিয়াল এনালিস্টগণ যারা ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৮ সালে যোদগান করেন, তাদের সকল প্রকার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও সেসময়ে ৮-১০ বছরের আগে কখনোই পদোন্নতি পাননি। কিন্তু মেধাবী না হওয়া সত্ত্বেও পদোন্নতিউত্তর ওই সকল ‘অপারেশন ম্যানেজার’ এবং আইটি সংশ্লিষ্টদেরকে প্রধান কার্যালয়সহ ব্যাংকের খুব ভালো জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। এই সুযোগে তারা লবিংয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করে মূলধারার মেধাবী ব্যাংকারদেরকে বঞ্চিত করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এতে পুরা ব্যাংকের কর্মপরিবেশ বিনষ্ট হওয়াসহ কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। 
ভুয়া সনদে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদানে জড়িত যারা 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও প্রদীপ কুমার দত্ত ২০০৪ সালের বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জড়িত। ২০০৮ সালে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে ওই পদোন্নতি কমিটির সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। এমনকি ব্যাংকের এমডি ও সিইও হিসেবে ২০১২ সালে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ওই ‘অপারেশন ম্যানেজার’ এবং আইটি সংশ্লিষ্টদেরকে ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রবল আপত্তি ও বিরোধিতা সত্ত্বেও পদোন্নতি প্রদান করেন। একইভাবে তিনি ২০১৫ সালে সকল নিয়মনীতি লঙ্ঘন ও সাধারণ ব্যাংকারদের আপত্তি উপেক্ষা করে আর্থিক অনিয়ম, অবৈধ লেনদেন, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তাদেরকে সাধারণ পদমর্যাদায় একীভূতকরণ করাপূর্বক পদোন্নতি প্রদান করেন বলে জানা গেছে। 
সূত্র বলছে, ওই অপারেশন ম্যানেজার এবং আইটি সংশ্লিষ্টদের অধিকাংশেরই মাঠপর্যায়ে সাধারণ ব্যাংকিং, ঋণ ও অগ্রীম, বৈদেশিক বাণিজ্য, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে জয়েন্ট কাস্টডিয়ান কিংবা ম্যানেজারিয়েল কার্যাদির কোনোটারই অভিজ্ঞতা ছিল না। এমনকি সাধারণ ব্যাংকিং সম্পর্কেও কোনোরূপ ধারণা ছাড়াই তাদেরকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সকল বিধি উপেক্ষা করে অনেক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিআরসি’র অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ ও ২০০৯ সালে নিয়োগকৃত কম্পিউটার অপারেটর এবং আইটি নামধারীদেরকে অধিকতর সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে বিধিমালা লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালে বিআরসি’র ২০০৮ ও ২০০৯ সালের সিনিয়র অফিসারদের পুরোপুরি বঞ্চিত করে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও কারচুপির মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) পদসহ অন্যান্য পদসমূহে বিআরসি’র যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে তিনবারের সিনিয়রিটি নম্বর সংশোধন করে যাবতীয় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কম্পিউটার ও আইটি সংশ্লিষ্টদের প্রধান কার্যালয়ের তৃতীয় তলার এক্সিকিউটিভ ফ্লোর, এইচআরএমডি, এইচআরডিডিসহ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের পদোন্নতি সংক্রান্ত সকল আর্থিক কর্মপরিবেশ বিনষ্টের মূলে ছিলেন ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি সরদার নূরুল আমিন এবং প্রধান কার্যালয়ের এইচআরএমডি’র ডিজিএম মো. আনোয়ার হোসেন। 
এ ক্ষেত্রে  তদন্তপূর্বক ব্যাংক ধ্বংসের মূল হোতা, খলনায়ক, প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ০৪ জুন ২০১৮ প্রকাশিত)